www.muktobak.com

বিপদের সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে ডিজিটালাইজেশন


 জ্যঁ তিরোল    ৩ জানুয়ারি ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ১১:২০    আন্তর্জাতিক


অ্যাপল, অ্যামাজন, ফেসবুক আর গুগলের মতো শীর্ষ প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো বিশ্বজুড়ে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলাকে স্পষ্টভাবেই ব্যাহত করছে। নিজেদের বন্য স্বপ্নগুলোকে ছাড়িয়ে যেতে তারা সফল হয়েছে (যদিও এক্ষেত্রে আমি খানিকটা সন্দিহান)। প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্নে এসব কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতারা বোধকরি এতকিছু আশা করেননি। যেমন গণতান্ত্রিক নির্বাচন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সর্বনাশা প্রভাব বিস্তারের ঘটনাগুলো যদি বিবেচনা করা হয়।

আমাদের সমাজে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রভাব ও সম্ভাবনাগুলো নির্ণয় করা যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলো জনমনে একই সঙ্গে আশা ও ভীতির সঞ্চার করেছে, আর তা নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, প্রযুুক্তি কোম্পানিগুলোর ছোট একটি দল আধুনিক অর্থনীতির প্রবেশদ্বারে রীতিমতো পাহারা বসিয়েছে।

বর্তমানের তথ্যপ্রযুক্তির বাজারগুলো ভীষণ কেন্দ্রীভূত, যা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একটি প্রতিষ্ঠানই গোটা বাজারে কর্তৃত্ব করছে। এটি কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয় যে, ব্যবহারকারীরা হাতে গোনা দুয়েকটি প্লাটফর্মে আসক্ত এবং তাদের সেবার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা ন্যায্যভাবে প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশের যথেষ্ট বৈধ ভিত্তি রয়েছে।

ত্রুটিপূর্ণ নেটওয়ার্ক

প্রযুক্তি বাজারগুলো কেন্দ্রীভূত হওয়ার পেছনে কারণ মূলত দুটি। প্রথমত, নেটওয়ার্ক এক্সটার্নালিটি; এর মানে যার সঙ্গে আমরা যোগাযোগ স্থাপন করতে আগ্রহী, তিনি যে নেটওয়ার্কে বিদ্যমান, শুরুতে আমাদেরও একই নেটওয়ার্কের আওতায় আসতে হয়। এটি ফেসবুকের ব্যবসার মডেল। এ মডেল ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক সফলতা নিয়ে সন্দেহের সুযোগ নেই, কিন্তু কোম্পানির স্বার্থগুলো উদ্বেগের। অন্য কোনো প্লাটফর্ম ব্যবহারের আগ্রহ থাকলেও আপনার বন্ধুরা যদি ফেসবুক ব্যবহার করেন, তাহলে আপনাকেও প্লাটফর্মটি ব্যবহার করতে হবে।

টেলিফোন যখন আবিষ্কার হয়েছিল, তখন একটি ফোন সিস্টেম ঘিরে প্রতিটি দেশে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের প্রতিযোগিতা শুরু হয়, যার পরিণতি দাঁড়ায় একচেটিয়া আধিপত্য। পুনশ্চ, এটিও অস্বাভাবিক কোনো বিষয় ছিল না। ব্যবহারকারী সহজেই ফোনে একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতেন, তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই তারা একক একটি প্লাটফর্মে সমবেত হন। আশি ও নব্বইয়ের দশকে টেলিফোন শিল্প ঘিরে যখন পুনরায় প্রতিযোগিতা চালু হয়, তখন সেক্ষেত্রে আন্তঃসংযোগের প্রয়োজন পড়ে, যার ফলে একজন ব্যবহারকারী অন্য নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে পারে। বিধিবিধান ছাড়া বর্তমান অপারেটররা ক্ষুদ্র ও নতুন অপারেটরদের প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। যদিও বিভিন্ন ফোন কোম্পানির চেয়ে সোস্যাল নেটওয়ার্ককে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান সহজ ও সাশ্রয়ী, যা এখনো সমন্বয়ের দাবি রাখে।

নেটওয়ার্ক এক্সটার্নালিটিগুলো সরাসরি হতে পারে, যেমন ফেসবুকের ক্ষেত্রে। আবার পরোক্ষও হতে পারে, যেমন বিভিন্ন প্লাটফর্ম নানা ধরনের অ্যাপস ও গেম তৈরি করে। যে প্লাটফর্মে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি, সেখানে অ্যাপসের সংখ্যাও বেশি। আপনি যদি উল্টো করে বলেন, সেটিও ঠিক। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত ভালো ক্রাউডসোর্স পূর্বাভাসের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও সেবার মান নির্ধারণ করতে পারে। যেভাবে গুগল সার্চ ইঞ্জিন ও নেভিগেশন অ্যাপ ওয়েজ কাজ করে। অপ্রচলিত অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে যেহেতু যথেষ্ট পরিমাণে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে নেই, তাই প্রতিযোগিতামূলক সার্চ ইঞ্জিনগুলো সাধারণ অনুসন্ধানের জন্য গুগলের ফলাফলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে পারে। উপরন্তু, নতুন সেবার জন্য তথ্যের প্রয়োজন হয়, বিদ্যমান সেবার ব্যবহারকারীরাই তা সরবরাহ করে।

সমস্যার মাত্রা

প্রযুক্তিবাজারে উচ্চপর্যায়ের কেন্দ্রীভূতকরণে দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে প্রভাবশালী সংস্থাগুলো ‘ইকোনমিকস অব স্কেল’ থেকে উপকৃত হচ্ছে। কিছু সেবায় বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়ে, এটি যদি সার্চ ইঞ্জিন বিষয়ক সেবা প্রতিষ্ঠান হয়, সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর দুই হাজার হোক কিংবা দুই ট্রিলিয়ন— উল্লিখিত সংখ্যক অনুসন্ধানের অনুরোধ আকর্ষণ করতে পারবে কিনা, তা বিবেচনায় নিয়ে সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে। পার্থক্যটি ঘটবে ব্যবহারকারীদের তথ্যের মূল্যমানে। দুই ট্রিলিয়ন সার্চ রিকোয়েস্টের বিপরীতে একটি কোম্পানি বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে দ্রুত চড়া অর্থ দাবি করতে পারে।

নেটওয়ার্ক শক্তি ও ইকোনমিকস অব স্কেলের মাধ্যমে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অযৌক্তিকভাবে ‘স্বভাবগত একচেটিয়া আধিপত্য’ বিস্তার করে। অনলাইন ইকোনমি অনেকটা ‘যিনি জিতবে, তিনি সিকেন্দার’ যুক্তি অনুসরণ করে। একসময় ইন্টারনেট ব্রাউজার মার্কেটে কর্তৃত্ব করেছে নেটস্কেপ নেভিগেটর, পরবর্তীতে মাইক্রোসফট ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার, আর এখন চালকের আসনে রয়েছে গুগল ক্রোম।

কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। ইকোনমিকস অব স্কেল ও নেটওয়ার্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজিটাল গান ও সিনেমার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করে না। এক্ষেত্রে বিভিন্ন প্লাটফর্ম রয়েছে যেমন অ্যামাজন প্রাইম, অ্যাপলের আইটিউন, ডিজার, স্পোটিফাই, প্যানডোরা ও নেটফ্লিক্স। তবে এ সেবাগুলো তাদের ব্যবহারকারীদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাত্রা দ্বারা আলাদা।

ব্যবসায়িক মডেলের নীতি পরিবর্তন

প্রচলিত প্রতিযোগিতা ব্যবস্থার পেছনের যুক্তিগুলো এখন আর বৈধ নয়, বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারক আর নিয়ন্ত্রকরাও এখন এ বিষয়টির মুখোমুখি হচ্ছে। একদিকে গুগল ও ফেসবুকের মতো প্লাটফর্মগুলো নামমাত্র মূল্য বা বিনা মূল্যে সেবা সরবরাহ করছে, আবার অন্যভাবে চড়া মূল্য নির্ধারণ করছে। স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি প্রতিযোগীদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করছে। প্রচলিত বাজার ঘিরে এ ধরনের চর্চাগুলোকে পুরস্কৃত করা হলেও সার্বিক অর্থে এটি ক্ষুদ্র কিংবা তুলনামূলক ছোট প্রতিযোগীদের দুর্বল কিংবা ধ্বংস করে। অন্যদিকে চড়া মূল্য ধার্যের মাধ্যমে বাজারে একচেটিয়া ক্ষমতার প্রয়োগ করা হচ্ছে।

এদিকে ছোট পরিসরের কিছু ডিজিটাল ফার্ম ও স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান সামঞ্জস্যহীন মূল্য ধার্যের চর্চায় নিয়োজিত। যেমন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অর্থায়ন করা বিনামূল্যের অনলাইন পত্রিকা। ডিজিটাল অর্থনীতিতে দ্বিপক্ষীয় বাজার ব্যবস্থা বিদ্যমান, সেক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রকের যদি এ ধরনের অপ্রচলিত ব্যবসায়িক মডেল সম্পর্কে ধারণা না থাকে, তাহলে সে ভুলভাবে মূল্য কমানো বা অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দিতে পারে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রকদের প্রতিযোগিতামূলক কৌশলের ক্ষেত্রে প্রচলিত নীতির যান্ত্রিক প্রয়োগের বিষয়টি এড়িয়ে চলতে হবে। নীতিগুলো মাল্টি-সাইডেড প্লাটফর্মের অনেক ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়।

দ্বিপক্ষীয় বাজারে প্রতিযোগিতার নীতি গ্রহণের জন্য নতুন নির্দেশিকা প্রয়োজন। স্বাধীনভাবে বিশ্লেষণের চেয়ে বাজারের উভয় দিক একত্রে বিবেচনায় আনতে হবে, তাছাড়া নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষেরও এখানে অনেক কিছু করার আছে। এক্ষেত্রে যত্নসহকারে কাজ করার পাশাপাশি একটি নতুন বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতির প্রয়োজন।

নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার পুনর্বিবেচনা

বিস্তারিতভাবে ডিজিটাল ইকোনমি নিয়ন্ত্রণের চারটি প্রচ্ছন্ন ক্ষেত্র রয়েছে— প্রতিযোগিতা, শ্রম আইন, গোপনীয়তা ও কর আরোপণ। কোনো কোম্পানি যখন কর্তৃত্বশীল অবস্থানে চলে যায়, তখন উচ্চমূল্য ও নতুন নতুন উদ্ভাবনের অভাবজনিত বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত একচেটিয়া প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে, অন্যথায় অর্থনীতির ভাষায়, বাজার প্রতিযোগিতার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যদি জোরালো প্রতিযোগিতা বজায় রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে আমাদের ন্যূনতম গতিশীল প্রতিযোগিতার বন্দোবস্ত করতে হবে; একটি কর্তৃত্বশীল প্রতিষ্ঠানকে কোনো একটি স্টার্টআপ কোম্পানি দিয়ে স্থাপন করার ক্ষেত্রে উচ্চতর প্রযুক্তি অথবা বাণিজ্যিক কৌশল গ্রহণ করার প্রয়োজন রয়েছে।

অনলাইন মার্কেটে প্রবেশের শুরুতে নতুন কোম্পানিগুলো প্রায়ই বিশেষ ধরনের পণ্য নিয়ে আসতে মনোযোগী থাকে; তারা যদি সফল হয়, তবে পরবর্তীতে আরো পণ্য ও পরিষেবার প্রস্তাব নিয়ে আসে। প্রথমে যেমন গুগল শুধু সার্চ ইঞ্জিন সেবা নিয়ে এসেছিল, অ্যামাজনের শুরুটা ছিল বই বিক্রির মাধ্যমে। গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারের প্রথম সারিতে প্রবেশ করতে পারছে কিনা। নতুনদের মধ্যে যদি কেউ ন্যূনতম একটি মৌলিক পণ্য নিয়ে হাজির হতে পারে, তবে তা প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির তুলনায় ভালো হবে। এমনকি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নতুনদের সামান্যতম সাফল্যকেও রুখে দেয়ার বিষয়ে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিতে চাইবে। কোম্পানিগুলোর স্বল্পমেয়াদি মুনাফা অর্জন বিঘ্নিত হচ্ছে বলে তারা এটি করবে না, বরং প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে যে একচেটিয়া প্রভাব বজায় রেখেছে, তাতে যেন কোনো ধরনের আঁচ না লাগে তা নিশ্চিত করতে চাইবে কিংবা প্রভাবশালী অন্যান্য কোম্পানির প্রতিযোগীদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে নতুনদের থামাতে চাইবে।

মূলত এ কারণেই ‘টাই-ইন-সেল’ একটি ক্ষতিকর বিরোধী-প্রতিযোগিতামূলক অনুশীলন। যেখানে কোনো একটি পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতাদের অন্য ধরনের পণ্যও কিনতে হয়, একচেটিয়া কোম্পানিগুলো বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন অনুপ্রবেশকারীদের বাজারে প্রবেশাধিকার অগ্রাহ্য করতে পারে। এমনকি এখনো এ সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে সর্বজনীন নীতি তৈরি করা অসম্ভব। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ প্রভাবশালী কোম্পানির টাই-ইন-সেল নীতির অনুসরণের বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে অথবা তাদের উদ্দেশ্য ও যৌক্তিক ভিত্তি অনুযায়ী বিপরীত চাল (যেমন স্বত্ব রেয়াত) প্রয়োগ করতে পারে।

পরিশেষে বলব, ডিজিটাল সেক্টরে উৎপাদনশীল প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য ধারাবাহিকভাবে এ প্রশ্নগুলো উত্থাপন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রকদের কঠোর বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

অধিগ্রহণের মানসিকতা

নতুন প্রবেশকারীরা বাজারের কর্তৃত্বশীল প্রতিষ্ঠানের হাতে নিজেদের তুলে দেয়ার মাধ্যমে প্রতিযোগিতার দৃশ্যপট আরো বেশি জটিল করে তুলছে। প্রভাবশালী কোম্পানিগুলো এক্ষেত্রে এতটাই বেপরোয়া যে, ভোক্তাদের নতুন কিংবা উন্নত পরিষেবার বিপরীতে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোকে তারা একচেটিয়া দাম ধার্যে উৎসাহিত করছে।

তবে তাদের এ ধরনের আচরণ পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে বলা যতটা সহজ, করা ততটাই কঠিন। অ্যান্টিট্রাস্ট আইন অনুসারে, বিশেষ করে আমেরিকায় এ ধরনের অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া রুখে দিতে কর্তৃপক্ষকে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ আনতে হয়। যেমন ওই প্রক্রিয়াটি প্রতিযোগিতা হ্রাসের পাশাপাশি ভোক্তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বিষয়টি বোধগম্য, তবে আইনের এ ধরনের মানদণ্ড অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া অকার্যকর করার বিষয়টি অসম্ভব করে তোলে। ফেসবুক যেমন ইনস্টাগ্রাম আর হোয়াটসঅ্যাপকে অধিগ্রহণ করেছে। এ-জাতীয় বাস্তব ক্রিয়া সংঘটিত হওয়ার আগে প্রক্রিয়াটির বিপরীতে যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করাটা সম্ভব হয়ে ওঠে না। অ্যান্টিট্রাস্ট আইনের কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগী কর্তৃপক্ষের যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতার ওপর নির্ভর করে।

 

নতুন অ্যান্টিট্রাস্ট আইন

প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের দ্রুত পরিবর্তনের ফলে প্রচলিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ক্রমে অকার্যকর হয়ে পড়ছে এবং প্রতিযোগীর নীতিগুলো সেকেলে হয়ে যাচ্ছে। একচেটিয়া দৌরাত্ম্য পতনে কিংবা পাবলিক ইউটিলিটি নিয়ন্ত্রণে একটি স্থিতিশীল প্রতিযোগিতামূলক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি কিংবা বিকল্প সুবিধাগুলো শনাক্তকরণ প্রয়োজন (যেমন রেললাইনের জন্য ট্র্যাক আর স্টেশন কিংবা বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ট্রান্সমিশন গ্রিড)। প্রবিধান বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর কার্যাবলির পুঙ্খানুপুঙ্খ জবাবদিহিতা দাবি করে, সেখানে কোনো আধিজাতিক নিয়ন্ত্রক থাকবে না। প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা পরিমাপের জন্য নির্দিষ্ট সংস্থা থাকবে, যা অসম্ভব।

এক্ষেত্রে আমাদের আরো সক্রিয় নীতি নির্ধারণ করতে হবে, যেমন ব্যবসায়িক পর্যালোচনাপত্র (কর্তৃপক্ষ দ্বারা নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে প্রতিষ্ঠানকে তার কাজ চালিয়ে নেয়ার জন্য যে সীমিত বৈধ নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়), নিয়ন্ত্রক বালুঘড়ির অধীনে যেখানে নতুন ব্যবসায়িক মডেলগুলো ‘নিরাপদ’ পরিবেশে পরীক্ষা করা যেতে পারে। নিয়ন্ত্রক ও অর্থনীতিবিদকেও বিনয়ী হতে হবে; তারা কাজের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন, তাছাড়া তাদের নীতিগুলোও ছুড়ে ফেলা উচিত হবে না।

 

ভারসাম্য স্থাপন

শ্রম আইন অনুসারে বিষয়টি স্পষ্ট, বর্তমান পদ্ধতিগুলো ডিজিটাল যুগের জন্য উপযুক্ত নয়। উন্নত বিশ্বের বেশির ভাগ শ্রমনীতিগুলো কয়েক দশক আগেও কারখানা শ্রমিকদের কল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। যেমন আংশিক হলেও নির্দিষ্ট মেয়াদের শ্রমচুক্তির দিকে মনোযোগ প্রদান করা হয়েছে। তবে এখন তা যথেষ্ট নয়, তাছাড়া টেলিওয়ার্কস, স্বাধীন ঠিকাদার, ফ্রিল্যান্সার, ছাত্র কিংবা অবসরপ্রাপ্তদের অনেকেই এখন উবারের চালক হিসেবে খণ্ডকালীন কাজ করছেন।

কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের উপস্থিতির সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আমাদের বরং কর্মীদের কাজের ফলাফলের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। বৈতনিক অনেক কর্মীর জন্যই বিষয়টি প্রযোজ্য, বিশেষ করে পেশাদারদের ক্ষেত্রে; কর্মক্ষেত্রে যাদের শারীরিক উপস্থিত স্রেফ একটি গৌণ শর্ত বৈ আর কিছু নয়। এছাড়া এমন অনেক পেশাদার কর্মী আছেন, কর্মক্ষেত্রে যাদের অবদান বা প্রচেষ্টাগুলোকে নজরদারি করা কঠিন।

বর্তমান শ্রমবাজারের প্রবণতাগুলোর মুখোমুখি দাঁড়ালে দেখা যায়, আইনপ্রণেতারা প্রায়ই কর্মসংস্থানের নতুন ব্যবস্থাগুলোকে পুরনো মোড়কেই রাখতে চান। যেমন— একজন উবার চালক কি চাকরিজীবী, নাকি চাকরিজীবী নয়? কিছু লোক হয়তো ‘হ্যাঁ’ সূচক উত্তর দেবে, কারণ ভাড়া নিয়ে যাত্রীর সঙ্গে দরকষাকষির সুযোগ তাদের নেই। তাছাড়া তাদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়; যেখানে পরিচ্ছন্ন বাহনের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, তুলনামূলক কম রেটিংয়ের কারণে উবার চালকদের বাদ দেয়ার অধিকার রাখে।

অন্যরা হয়তো দ্বিমত পোষণ করে বলবেন, উবারচালকরা চাকরিজীবী নয়। মোটের ওপর তারা সিদ্ধান্ত নিতে স্বাধীন— কখন, কোথায় ও কতটা সময় তারা কাজ করবেন। কিছু চালক আছেন, যাদের উপার্জনের শতভাগই আসে উবার কার্যক্রমের মধ্যমে। অন্যরা হয়তো উবারের পাশাপাশি অন্যান্য রাইড শেয়ারিং প্লাটফর্মে কাজ করেন অথবা কেউ হয়তো আরো বেশি অর্থের আশায় কোনো রেস্তোরাঁয় খণ্ডকালীন চাকরিতে নিয়োজিত। স্বাধীন ঠিকাদারের মতোই তারাও নিজস্ব অর্থনৈতিক ঝুঁকি বহন করেন।

উপরন্তু, স্বনির্ভর কর্মীদেরও বিভিন্ন ধরনের নিয়ম-কানুন ও সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অনেক দেশে স্বাধীন চিকিৎসকদের চাকরিজীবী হিসেবে ধরা হয় না। এমনকি তারা নিজেদের পারিশ্রমিক নিজে নির্ধারণ করতে পারেন না, তাছাড়া তারা নির্দিষ্ট কিছু নিয়মও অনুসরণ করেন, নচেৎ তাদের নিজস্ব স্বীকৃতি হারাতে হয়।

দুর্ভাগ্যক্রমে উবারচালক ও অন্য প্লাটফর্মের কর্মীদের পদমর্যাদার বিষয়টি খানিকটা তর্কসাপেক্ষ, তবে তা দিয়ে কিছু যায় আসে না। আমরা যেকোনো সিদ্ধান্তেই পৌঁছাই না কেন কিংবা যে শ্রেণীবিন্যাসকে নির্ধারণ করি না কেন, তা ইচ্ছাকৃত আর অযৌক্তিক হবে অথবা ব্যক্তিগত মতামত ও মতাদর্শগত প্রবণতা থেকে কাজের নতুন বিন্যাসগুলোকে ইতিবাচক বা নেতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করা হবে। যেকোনোভাবেই বিতর্কটি খুব একটা অগ্রসর হবে না, কারণ আমরা শ্রমিকদের কল্যাণের চেয়ে কাজকেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকি।

এক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক নিরপেক্ষতা নিশ্চিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে; বেতনভোগী কর্মী কিংবা স্বনির্ভর ব্যক্তি— কোনো পক্ষকেই অগ্রাধিকার প্রদান করা উচিত নয়। গিগ ওয়ার্কার বা অস্থায়ী শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তার অধিকারসহ রাষ্ট্রের কিছু সুবিধা প্রদান করতে হবে, যেমন উবারচালক। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্লাটফর্মকে অযৌক্তিক করে তোলে, এমন অপরিচিত ও বিঘ্ন উৎপাদক নীতিনিয়মকে বাদ দিতে হবে।

 

গোপনীয়তা পুনরুদ্ধার

ভোক্তাদের ব্যক্তিগত জীবনে অনধিকার ভিত্তিতে প্রবেশকারী প্রতিষ্ঠান আর সরকারকে প্রতিহত করতেও অগ্রগতির প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্বব্যাপী আমরা কমবেশি সবাই অবহিত, প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের কাছ থেকে প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করে নিয়েছে, যা কোনোভাবেই শুভ নয়। বিষয়টি নিয়ে আমরা সচেতন থাকলেও সার্বিক প্রক্রিয়া ও এর পরিণতির সত্যিকারের মাত্রা উপলব্ধি করতে প্রায়ই ব্যর্থ হই।

একটি বিষয় নিশ্চিত, আমরা যতটা কল্পনা করতে পারি, সরকার আর প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের থেকে তার চেয়েও বেশি তথ্য সংগ্রহ করছে, যার ওপর আমাদের ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণ নেই। উদাহরণস্বরূপ, কোনো একটি কোম্পানি আমাদের কাছ থেকে যেসব তথ্য সংগ্রহ ও জমা করে এবং অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেয় (ই-মেইল, ছবি কিংবা সোস্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে), অথচ ওই প্লাটফর্মগুলো হয়তো আমরা কখনো ব্যবহার করব না কিংবা ব্যবহারে আগ্রহী হব না।

আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, বিশেষ করে আইনি ব্যবস্থার মৌলিক নীতির বিপরীতে নিজেদের অধিকার নিয়ে অচেতন থাকার আর কোনো সুযোগ নেই। বিভিন্ন প্লাটফর্মে দেয়া নিজেদের সম্ভাব্য সংবেদনশীল তথ্য (যেমন ধর্ম, রাজনীতি, লৈঙ্গিক অবস্থান) নিয়েও আমাদের চিন্তিত হওয়া উচিত। উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত সুদূরপ্রসারিত রাষ্ট্রীয় নজরদারির প্রক্রিয়াগুলো নিয়েও।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের জেনারেল ডাটা প্রোটেকশন রেগুলেশন এ ধরনের হুমকি থেকে আমাদের সুরক্ষিত করার পক্ষে ছোট একটি পদক্ষেপ মাত্র। পরবর্তী ধাপে একগুচ্ছ মানসম্পন্ন নীতি তৈরি করা উচিত, যা প্রত্যেকের জন্য বোধগম্য হয় (রাষ্ট্রীয় প্রবিধান উদারপন্থী নিয়ন্ত্রণবাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ)।

 

আশা জাগিয়ে রাখা

পরিশেষে বলব, ইন্টারনেটের কোনো সীমারেখা নেই (যা ইতিবাচক একটি বিষয়), এক্ষেত্রে কর প্রতিযোগিতা রোধে এবং অর্থনীতির বিশাল পরিসর থেকে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যে প্রদানযোগ্য কর দিয়ে রাষ্ট্রকে সহযোগিতা করতে হবে। অনলাইনে ক্রয়ের ওপর কর প্রতিযোগিতা রোধে ২০১৫ সালের শেষ দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চুক্তিটি একটি প্রতিশ্রুতিশীল প্রস্তাবনা। উল্লেখ্য, ইইউ নীতি রাষ্ট্রকে যেকোনো অনলাইন নির্ভর কেনাকাটার ওপর মূল্যসংযোজন কর প্রয়োগের অনুমোদন দেয়, আগের নিয়মে সরবরাহকারীর ওপর কর ধার্য করা হতো।

নতুন ব্যবস্থাটি অ্যামাজনের মতো ব্যবসায়িক মডেলের জন্য সন্তোষজনক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এতে গুগলের মতো প্লাটফর্মগুলোর সমস্যার সমাধান মেলে না। গুগলের মতো প্রতিষ্ঠান মূলত ব্রিটিশ, ডাচ, ফরাসি কিংবা জার্মান ভোক্তাদের কাছে কোনো পণ্য বিক্রি করে না কিন্তু বিজ্ঞাপনদাতাদের ওপর অর্থ ধার্য করে। উন্নত অর্থনীতির নীতিনির্ধারকদের সবাই এ সমস্যাটি নিয়ে আলোচনা করছে, কারণ বই কিংবা মিউজিক বিক্রির মতো বিষয়গুলোয় কর ধার্যের মতোই গুগলের বিষয়টিও সবার কাছে কমবেশি স্পষ্ট।

সবাই বলছে, ডিজিটালাইজেশন সমাজের জন্য দারুণ সব সম্ভাবনা ও সুযোগ নিয়ে এসেছে; তবে একই সঙ্গে এটি কিন্তু অন্যদের বিপন্ন করে তোলার পাশাপাশি নতুন অনেক বিপদের সঙ্গেও আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। এ নতুন বিশ্বে অর্থনৈতিক সুফল অর্জনের জন্য জনসাধারণের আস্থা অর্জন, সামাজিক সংহতি, তথ্য মালিকানা এবং প্রযুক্তিগত প্রসারের প্রভাব সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। অ্যান্টিট্রাস্ট, শ্রম আইন, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা আর কর আরোপণের মতো বিষয়গুলো ঘিরে আমরা কতটা কার্যকর নতুন পন্থা নিয়ে অগ্রসর হতে পারি, তা ওপর আমাদের সার্বিক সাফল্য নির্ভর করবে।

লেখক: ২০১৪ সালে অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ।

(সম্ভাবনার পাশাপাশি বিপদের সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে ডিজিটালাইজেশন লেখাটি বনিকবার্তার ২০১৯ বর্ষ শুরু সংখ্যার বিশেষ সাময়িকিতে প্রকাশিত। -মুক্তবাক)




 আরও খবর